বাল্যস্মৃতি- ছেলেবেলা
জন্ম থেকে ১৯৫০ সালের আরম্ভ পর্যন্ত স্মৃতি, যৎসামান্য যা মনে আছে তা এখানে লিখে রাখছি ছেলে মেয়ে নাতি নাতনিদের জন্য| ঐ বছর উদ্বাস্তু হয়ে আমরা কলকাতা চলে আসি| সেই ঘটনাবলির বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছি Udbastu2.pdf নামক অংশে|
অবিভক্ত বাংলার যশোহর জেলার নড়াইল টাউনে(অধুনা বাংলাদেশে) ১৯৩৫ সালের ৮ই জুলাই(বঙ্গাব্দ ১৩৪৩, ২৩শে আষাঢ়) সকাল 11:49 মিনিটে আমার জন্ম হয়| পিতা সুরেন্দ্র প্রসাদ নিয়োগী ও মাতা প্রফুল্লবালার ছয় ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে আমি পঞ্চম| জ্যোতিষ মতে কন্যা রাশি, কন্যা লগ্ন, লগ্নে চন্দ্র-মঙ্গল যোগ, দ্বিতীয়ে বৃহস্পতি দ্বাদশে শুক্রের সঙ্গে ল্গ্ন শুভ-কর্তরি যোগ করেছে| মঙ্গল আত্মকারক| জন্মের সময় অনুযায়ী দিবার্ধ-রাজযোগ হয়েছে, যা জাতককে খ্যাতি দেবে|
আমাদের আদি নিবাস টাঙাইল|
নড়াইল একটি সাবডিভিসনাল টাউন| এখানকার জমিদাররা এখানে যে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন সেই নড়াইল ভিক্টরিয়া কলেজে বাবা সংস্কৃত ও বাংলার অধ্যাপক ছিলেন| ছোট টাউন, একটাই বড় রাস্তা| তখনকার দিনে খুব বেশি পাকা বাড়ি ছিল না| আমরা যে বাড়িতে থাকতাম সেটির খড়ের চাল ছিল, দুখানা বড় ঘর, বারান্দা মাটির তৈরি ছিল| পাশে রান্নাঘর| বাড়ির দেওয়াল ছিল মনে হয় টিন বা চাটাইয়ের| বাড়িতে অনেকটা জায়গা ছিল| বাড়ির সামনে দিয়ে প্রশস্ত কাঁচা রাস্তা গেছে| এই রাস্তায় বাস চলত| বাড়ির পাস দিয়ে, বড় রাস্তার সঙ্গে আড়াআড়ি ভাবে একটা সরু কাঁচা রাস্তা নদীর ঘাটের দিকে গেছে| নদীটি হল চিত্রা নদী| এই নদীতে লঞ্চ/স্টিমার চলত| যশোহর জেলার বৈদ্য প্রধান গ্রাম কালিয়া যাওয়া যেত এই স্টিমারে| আমার শ্বশুরবাড়ির আদি নিবাস এই কালিয়া গ্রামে| কালিয়া আবার দুভাগে বিভক্ত_- বড় কালিয়া আর ছোট কালিয়া| কালিয়ার বৈদ্যরা কুলিন-শ্রেষ্ঠ | অনেকে জানেন না, আমরাও কুলিন বৈদ্য, “দ্রুহি সেন”, নিয়োগী পদবি নবাবি আমলে পাওয়া| বিখ্যাত কবি ধোই(দ্রুহি), যিনি লহ্মণ সেনের সভাকবি ছিলেন এবং কালিদাসের “মেঘদূতের” মত “পবনদূত” কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন, রাজা লক্ষণ সেন তাঁকে কৌলিন্য প্রদান করেন| তিনি আমাদের পূর্বপুরুষ|
নড়াইলে প্রতি রাতে চৌকিদার, “বাবু জাগেন, বাবু জাগেন” চিৎকারে সবাইকে জাগাত| উত্তর না দেয়া পর্যন্ত চিৎকার চলত| আমার বয়স তখন দেড় কি দুই| আমি নাকি ঘুমের মধ্যে বলে উঠতাম “হুম”| আর ঐ বয়সে পুলিস সম্বন্ধে আশ্চর্য উঁচু ধারনা ছিল| আমি নাকি বলতাম, “পুলিস ঘরের সমান উঁচু”| এই নিয়ে সবাই নাকি খুব মজা করত| মার কাছে শুনেছি, সেই কালে নড়াইলে খুব অল্প ব্যয়ে কাজের লোক পাওয়া যেত| আমাদের বাড়িতে ঝি, চাকর ও ঠাকুর ছিল, সবাই উড়িয়া| এক জনের নাম মনে আছে পরিক্ষীৎ| বেশিরভাগ সময় আমি এদের কোলে পিঠে থাকতাম| এরা খুব পান খেত এবং আমাকেও খাওয়াত| ঐ বয়সে আমার পানের নেশা হয়| পরে ময়মনসিংহে গিয়ে, যখন আমার বয়স ৬/৭, আমি পান সুপারি খেতাম মনে আছে| ময়মনসিংহে কলেজ রোডের বাড়িতে একটা সুপারি গাছ ছিল| শীতকালে গাছ থেকে সুপারি পেড়ে কাঁচা সুপারি রোদে শুকানোর জন্য ছাদে দেওয়া হত| আমি ছাদে উঠে পাহারা দিতাম যাতে কাকে সুপারি নিয়ে না পালায়, আর মাঝে মাঝে কাঁচা সুপারি খেতাম,- বেশ নেশা হত| ফলস্বরূপ কিনা সঠিক জানিনা, ছোট বেলায় আমি একটু তোতলা ছিলাম, অনেকদিন|
১৯৪০ সাল নাগাদ বাবা মেদিনীপুর কলেজে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন| খাপ্রেল বাজার নামক অঞ্চলে একটা লাল রঙের দোতলা পাকা বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়| বাড়ির সামনে দিয়ে গেছে বড় ড্রেন| মেদিনীপুরে আমরা এক পাঠশালায় ভর্তি হই| আমরা বলতে সেজদা(নিতাই ওরফে শিবেশ), দিদি(খুকু ওরফে দীপালি) আর আমি দুলাল(ওরফে প্রদীপ)| এই পাঠশালায় শৃঙ্খলা ছিল খুব কড়া| যখন তখন বেরোন যেত না| “দিদিমনি একে যাই”, অর্থাৎ পেচ্ছাপ করতে যেতে চাই বলে অনুমতি নিয়ে তবে বেরোন যেত| একদিন, ঠিক কি হয়েছিল মনে নেই, শাস্তিস্বরূপ আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়| পেচ্ছাপ করতে যাব বলে ছুটি চেয়েও পেলাম না, দাঁড়িয়ে থাকতে হল| আমি ছিলাম এক কোনায় দেয়াল ঘেঁষে, অন্যরা বসেছিল মাটিতে পাটের তৈরি আসন পেতে| কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর এবং পেচ্ছাপ করার ছুটি না পাওয়ায় আমি দেয়ালের গায়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করে দি| অন্য ছাত্ররা সব চেঁচিয়ে ওঠায় ধরা পড়ে যাই, বকুনি খাই| আর বেচারি দিদিকে মগে করে জল নিয়ে এসে ঝাঁটা দিয়ে ঘর পরিষ্কার করতে হয়| বেচারি দিদি আমার থেকে মাত্র দেড় বছরের বড়| সে দিনের মত ছুটি হয়ে গেল|
পরের বছর বাবা ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে সংস্কৃত ও বাংলার অধ্যাপক পদে যোগ দেন| আমরা ভাড়া নিই “কেশববাবুর বাঙলো” বাড়ি| অনেকটা জায়গা ছিল বাড়িটাতে, নানারকম ফলের গাছ ছিল| কেশববাবু মুক্তাগাছার জমিদার ছিলেন, তারই বাঙলো বাড়ি| ওখানকার মিশনারি স্কুলে আমাকে আর দিদিকে ভর্তি করে দেওয়া হয়| প্রিন্সিপাল ছিলেন হগবেন নামে মেমসাহেব| শিক্ষিকারা কেউই বোধ হয় বাঙ্গালি ছিলেন না, যদিও সবাই পরিষ্কার বাংলা বলতেন| আমরা নার্সারি ক্লাসে ভর্তি হই| দিদি অঙ্কে খুব ভাল ছিল, অঙ্কে ১০০ তে ১০০ পায় ফাইনাল পরীক্ষায়| আমরা দুজনেই ডবল প্রমোশন পাই, এবং ক্লাস টু তে উঠি| এই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, জাপানিরা কলকাতায় বোমা ফেলে কিছুদিন পরে| কেশববাবুর বাংলোবাড়ি ARP requisition করে নেয়| তাই ঐ বাড়ি ছেড়ে আমরা কলেজের কাছে, কলেজ রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে উঠে যাই| ১৯৪৩ সালের জানুয়ারি মাসে আমি মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে, আর দিদি বিদ্যাময়ী স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হই| ১৯৫০ সালের ২২শে মার্চ পর্যন্ত আমি এখানে পড়ি| তারপর আমরা সবাই উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতা চলে আসি| এসম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ Udbastu2.pdf নামক লেখায় লিপিবদ্ধ করেছি|
আমরা ভাইরা সবাই মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে পড়েছি, জয়ন্ত বাদে, ও ছোট ছিল| দাদা(সুরেশ ওরফে অগুরু) এই স্কুল থেকে ১৯৪৪ সালে আর সেজদা (শিবেশ ওরফে নিতাই) ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করে| সেজদা বরাবরই খুব ভাল ছাত্র ছিল, আমিও খারাপ ছিলাম না, যদিও ক্লাস সিক্স পর্যন্ত আমার রেজাল্ট খুব সাধারন হোত| এমনকি অঙ্কেও আমি শতকরা ৬০/৭০ এর বেশি পেতাম না, যদিও কারও সাহায্য ছাড়াই বইয়ের সব অঙ্ক আমি করতে পারতাম এবং অত্যন্ত দ্রুত, কখনো বা মুখে মুখে অঙ্ক কষে ফেলতাম| বাবা একদিন সেজদাকে বললন, নিতাই দেখতো দুলাল অঙ্কে এত কম নম্বর পায় কেন? ওকি অঙ্ক বোঝে না? সেজদা উত্তর দিল, ও কোন অঙ্ক একবারের বেশি করে না, আর ছট্ ফট্ করে তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে ভুল করে, রিভিশন করে না| বইয়ের প্রত্যেকটা অঙ্ক অন্তত দুতিনবার করে কষতে হবে| তেমনি অন্য বিষয়ে, যেমন ইতিহাস, ভূগোল, ইংরেজি, বাংলা সব প্রশ্নের উত্তর লিখে পরীক্ষার জন্য তৈরি করতে হবে| অর্থাৎ দিনে রাতে মিলিয়ে ২/৩ ঘন্টার জায়গায় ৫/৬ ঘন্টা পড়াশুনা করতে হবে| সারাদিনে এক ঘন্টা পড়তে বসেই টো টো করে ঘুরে বেড়ানো চলবে না| সেজদার পরামর্শে পরের বছরই আমি ক্লাস এইটে চারটে সেকশন মিলে ফার্স্ট হই|
ময়মনসিংহ, বিশেষ করে মৃত্যুঞ্জয় স্কুল আমার খুব ভাল লাগত| দশটায় ক্লাস শুরু হত| আমরা সবাই দলবদ্ধ হয়ে মাইল খানেক দূরের স্কুলে হেঁটে যেতাম, খালি পায়ে| ওখানে জুতো বা স্যাণ্ডেল পড়ার রেওয়াজ ছিল না| ক্লাস সুরুর আগে পোঁছলেই বন্ধুরা মিলে গুলি খেলতাম| টিফিনের সময় স্কুলের বাইরে বেরোতাম| স্কুলের পাশ দিয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদী| অনেক সময় সেদিকে যেতাম| পুজোর ছুটির কিছুদিন আগে থেকেই দেশ বিদেশ থেকে মালপত্র বোঝাই বড় বড় নৌকো এসে ভিড়ত| অনেক সময় নারকেল বোঝাই নৌকো আসত| এগুলো ঘুরে দেখতে বেশ ভাল লাগত|
মিশন স্কুলে আমি আর দিদি এক বছর পড়েছিলাম| হগবেন মেমসাহেব স্বয়ং আমাদের বাংলা পড়াতেন, সাহেবি উচ্চারণে| আমারাও সাহেবি উচ্চারণে বাংলা পড়তে শিখলাম| রবিবার রবিবার সকালে আমরা চার্চে যেতাম এবং বাইবেলের গল্প শুনতাম| বছরের শেষে প্রাইজ পেতাম|
কেশববাবুর বাংলো বাড়িতে অনেক জায়গা ছিল, আর অনেক গাছ, ঝোপ ঝাড় জঙ্গল ছিল| আমাদের লুকোচুরি খেলার সুবিধে ছিল| গ্র্রীষ্মের ছুটিতে দুপুরে না ঘুমিয়ে আমরা গাছে চড়তাম| একদিন দুপুরে খেলতে খেলতে সেজদা একটা পেয়ারা গাছের উঁচু ডাল থেকে মাটিতে লাফ দেবার সময় পায়ে একটা গজাল(লোহা) ঢুকে যায়| ডাক্তার দেখাতে হয়| অনেকটা বড় ক্ষত হয়| কাটাছেঁড়া করে, ওষুধ দিয়ে ভিতরে গজ ঢুকিয়ে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দেওয়া হয়| অনেকদিন সেজদা হাঁটতে পারত না, পরে লাঠি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটত| সেজদাকে আমরা ল্যাংড়া বলে খেপাতাম| তাই শুনে সেজদা আমাদের, অর্থাৎ দিদি ও আমাকে মারতে আসত, আমরা দৌড়ে পালিয়ে যেতাম| এই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে| জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে| ARP বাড়ি অধিগ্রহণ করে নেওয়ায় আমরা কলেজ রোডের ভাড়া বাড়িতে উঠে গেলাম| সেই বাড়িতে ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না| সারাদিন হুড়োহুড়ি করে সন্ধ্যা লাগতে না লাগতেই আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম| রাত্রেও উনুন ধরিয়ে মা রান্না করতেন, ভাত ডাল ভাজা তরকারি| বাবার হুকুম ছিল, বিকেলে খেলতে যাও , কিন্তু অন্ধকার হবার আগে বাড়ি ফিরবে, হাত পা ধুয়ে পড়তে বসবে| লন্ঠন জ্বালাতে হোত| মাটিতে মাদুর বা সতরঞ্চি পেতে একটা লন্ঠনের চারপাশে আমরা তিন চারজন গোল হয়ে বসে পড়াশুনা করতাম| এই নিয়ম আমরা সবাই মেনে চলতাম, ব্যতিক্রম মেজদা| পড়াশুনায় মন ছিল না একেবারেই এবং বাবার কাছে খুব মার খেত| বাড়িতে গরু তাড়ানোর একটা লাঠি ছিল| রেগে গেলে বাবা মেজদাকে সেই লাঠি দিয়ে মারতেন| মার ধারণা, ওই রকম মারের চোটে মেজদার বুদ্ধিহানি ঘটে; পরীক্ষা পাস করতে পারে না|
মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে আমি ক্লাস থ্রি তে ভর্তি হই| সে সময় আমার একটি অঘটন ঘটে| ১৯৪৩ সালের জানুয়ারি মাসে একদিন বিকেলে বাবার সঙ্গে ওখানকার নতুন বাজারে বাজার করতে গেছি| ফেরার পথে আমার হাতে মাছের থলি ছিল| আড় মাছ কেনা হয়েছে| আড়মাছের বড় কাঁটা কি করে যেন আমার পায়ে ঢুকে যায় এবং সেপটিক হয়ে ওঠে| সারতে পনেরো কুড়ি দিন সময় লাগে| আমি স্কুলে যেতে পারি নি|
এই সময়ের কিছু আগে আমার টাইফয়েড হয়েছিল, তারপর ম্যালেরিয়া হোত, মাঝে মধ্যে| আর ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে, “পঞ্চাশের মন্বন্তর” নামক কুখ্যাত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়| অখণ্ড বাংলায় আনুমানিক ৫০ লক্ষ লোক না খেতে পেয়ে মারা যায়| আমাদের বাড়িতে গ্রাম থেকে দলে দলে লোক আসত ভিক্ষা চাইতে| ভিক্ষা কোথায়? তখন তারা একটু ভাতের ফ্যান চাইত| কিন্তু ফ্যান ই বা কোথায়? টাউনহলে মিথাপিছু কিছু রেশন দেওয়া হোত| তার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হোত| কি দিত সঠিক মনে নেই, তবে ছোট ছোট করে কাটা শুকনো আলু দিত মনে আছে, তাতে বেজায় বোটকা গন্ধ| তখন কয়েক মাস আমাদের ও খাবার খুব কষ্ট গেছে| গম ভাঙ্গিয়ে আটার রুটি বানানো হোত| আমরা ভেতো বাঙ্গালী, আটার রুটি আগে কখনো খাই নি, খেতে ভাল লাগত না| ভাত পাওয়া যেত না| মাঝে সাঝে রেশনে মোটা বার্মার চাল দিত, সে অত্যন্ত নিম্নমানের চাল| সান্ত্বনা এই যে সবারই কষ্ট হচ্ছে, আমরা শুধু একা নই| আমি ও দিদি রেশন আনতে লাইন দিয়েছি, প্রধান দায়িত্ব ছিল সেজদার; মেজদাও লাইন দিত আমাদের সঙ্গে| এইভাবে আমাদের কলেজ রোডের ভাড়া বাড়ির দিন শুরু হল| অবশ্য এই প্রচণ্ড দুঃসময় সাময়িক, শিঘ্রি কেটে গেল| কিন্তু আমাদের আর্থিক অনটন গেল না, বরং বাড়তে লাগল| আমাদের অবস্হা “নুন আনতে পান্তা ফুরোয়” এর মত| এই সময় কারু অসুখ বিসুখ করলে বড় মুস্কিল, ডাক্তার দেখানোর পয়সা ছিল না| আমার মনে আছে, একাধিক সার্ট পড়ার বিলাসিতা আমাদের ছিল না| কন্ট্রোলে সস্তায় লংক্লথ, মার্কিন জাতীয় কাপড় দিত| তা দিয়ে মা আমাদের জামা, হাফ প্যান্ট ইত্যাদি বানিয়ে দিতেন| মা সেলাইয়ের কাজ ভাল জানতেন| নড়াইলে থাকতে, আমাদের জন্মের পূর্বে বাবা মার জন্য মেশিনে সেলাই শেখানোর মাস্টার রেখে দেন| বাবা ছানার তৈরি মিষ্টি খেতে ভাল বাসতেন| হালুইকর রেখে মাকে মিষ্টি বানানো শিখিয়েছেন| বেশ ভাল হোত মার তৈরি সন্দেশ ইত্যাদি|
পরবর্তীকালে আমরা যখন একটু একটু করে বড় হয়ে উঠলাম, তখন জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেল, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে ও তারপরে| পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় একটা গান খুব চালু হয়েছিল, যার কিছু লাইন আজ ৭৫ বছর পরেও আমার মনে আছে, যেমন,-
“ক্যলকাটা 1943 র অক্টোবর, ARP মিলিটারি পথে পথে ভিখারি| অ্যাক্সিডেন্ট আর ক্রাউড, কন্ট্রোল লাইন লাগাও,…বাড়ির বউরা রান্না ছেড়ে লাইন দিয়েছে| লাখে লাখে লোক জমেছে কলিকাতায়, ভিখারিরা নোংরা করে রাস্তা চলা দায়| একটি পয়সা দাও গো বাবু যখন তারা বলে, বাবুরা দেয় মুখঝ্যামটা, কঁ কঁ কঁ কঁ মটরগাড়ি যখন জোরে চল, কত লোকের যে হল পেট চ্যাপ্টা|….
একটু বড় হবার পর থেকে, বোধ হয় ক্লাস ফাইভে ওঠার পর থেকে আমি একা বাজার করতাম| সকালের মাছের বাজার ছিল আমাদের কলেজ রোডের বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূরে| হেঁটে যেতে অন্তত আধ ঘন্টা লাগত| প্রথম দিকে সেজদা বাজার করত, কিছুদিন পরে পড়াশুনার চাপ বাড়লে সেজদা বড় একটা বাজারে যেতে চাইত না, আমিই যেতাম| ময়মনসিংহে মাছ খুব সস্তা ছিল, বিশেষ করে কাছেই “কুইল্যার চড়” বলে একটা জায়গা ছিল, সেখান থেকে প্রচুর মাছ আসত খুব সস্তা, যদিও খুব ভাল মানের নয়| যেমন, তিন কেজি একটা রুই বা কাতলা মাছের গাদা, কিলোটাক ওজন হবে, ৪/৬ আনায়(১৬ আনায় ১ টাকা) পাওয়া যেত| আস্ত রুই কাতলা ১টাকা/১২আনায় দেড়/দুই কিলোর মাছ পাওয়া যেত| তখন অবশ্য ওজন করে মাছ বিক্রি হোত না| মাছওয়ালারা মাছ কেটে ভাগা দিয়ে রাখত, দরাদরি করে কিনতে হোত| আমরা বেশি তরকারি খেতাম না| আমি তো আলু ছাড়া অন্য কোন তরকারি খেতাম না| নানারকমের মাছ পাওয়া যেত, ব্রহ্মপুত্র নদীর মাছ, প্রচুর আমদানি| আড়, বোয়াল, চিতল, ইলিশ পাওয়া যেত খুব ভাল মানের, তাছাড়া নানারকমের ছোট মাছ ছিল অঢেল ও সস্তা| এদের মধ্যে বাবার পছন্দ ছিল টাটকিনি (পার্শে মাছের জাত)| এক ভাগায় হয়ত এক সের(১ কিলোর কিছুটা কম), দাম আনা চারেক| এই দাম অনেকের অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, তবে আমিও লিখছি ৭০/৭৫ বছর আগের কথা| এমন দেশের কথা, যে দেশ আমি ছেড়ে এসেছি ৬৮ বছর আগে এক কাপড়ে এবং যার পরে আর যেখানে আমি যাইনি| স্মরণে অল্পস্বল্প ভুল হতে পারে| যেমন, এক কিলো সাইজের ইলিশ এক টাকার বেশি দাম না| সেই সময় আমাদের বাড়ি গরুর দুধ দিয়ে যেত, টাকায় আড়াই/তিন সের, ১৬ কেজির টিন ভর্তি মুড়ি দিয়ে যেত এক টাকায়, খুব ভাল ফাইন মুড়ি, চাল বাড়িতে দিয়ে যেত, খুব ফাইন চাল, নাম বা দাম মনে নেই|
১৯৪৬ সালে অনেক জায়গায় প্রবল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, কলকাতায় মুসলিম লিগ “Direct action day” ঘোষণা করে| অনেক হিন্দু ও অনেক মুসলমান খুন হয়| এরই পাল্টা action হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল প্রভৃতি মুসলমান প্রধান অঞ্চলে| ফলে, ভারত দ্বিখণ্ডত হয়, East Pakistan গঠিত হয়, আমরা বৃটিশ শাসনমুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করলাম ১৫ই অগাষ্ট ১৯৪৭ | আমদের চেনা জানা আত্মীয় স্বজন অনেক হিন্দুরা ঘর বড়ি ছেড়ে, পূর্বপাকিস্তান ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়| আমরা ময়মনসিংহে থেকে গেলাম, ওপারে যাব না, বাবা বললেন এবং ওপারে যাবার কোনরকম চেষ্টা করলেন না| ভারত ভাগের বিষময় ফল আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি| হিন্দু মুসলমান বিভেদের মন্ত্র বৃটিশ শাসকরা আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, যার বিষ রাজনীতিতে ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় এখন ও চলে আসছে|
কলেজ রোডের বাড়িতে আমরা আট বছর ছিলাম| ঘর দুটোতে সারি সারি চোকি(তক্তপোষ) পাতা ছিল, মাঝে কোন ফাঁক ছিল না| বড় ঘরে আমি শুতাম বাবার পাশে, তারপরে মন্টু, সেজদা তারপর দিদি| অন্য ঘরে মার পাশে জয়ন্ত; পাশে একটা পুরো চৌকি নিয়ে শুত মেজদা| বসার ঘর এবং বাইরের ঘরেও চৌকি পাতা ছিল| বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না, কাজেই ফ্রিজও ছিল না| রোজ বাজার করতে হত, কারন আমরা দুবেলা মাছ খেতাম| মা দুবেলা উনুন ধরিয়ে রাঁধতেন| ছুটির দিনে দুপুরে আমরা মেঝেতে আসন পেতে বসে খেতাম- অগুরু, নিমাই, নিতাই, খুকু, দুলাল, মন্টু, খোকন(জয়ন্ত) ও বাবা, সবাই খাবার জন্য তৈরি হয়ে বসে আছে| দিদি মাকে পরিবেশনে সাহায্য করত| খাবার জল দেওয়া হোত কাঁসার গ্লাসে| পদ বেশি হোত না, ডাল, ভাত, ভাজা, মাছের ঝোল, মাঝে সাঝে তরকারি হোত| আমি ডাল আর আলুভাজা খেতাম| রুই মাছ ছাড়া অন্য মাছ খুব একটা ভালবাসতাম না| ভাল মাছ থাকলে মেজদা সেজদার ক্ষিদে বেড়ে যেত এবং হাড়ির ভাত খালি হয়ে যেত, মাকে হয়ত মুড়ি টুড়ি কিছু একটা খেতে হত|
ময়মনসিংহে খুব বৃষ্টি হত, বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস বর্ষাকাল ছিল| আমার খুব ভাল লাগত| রাতে রান্নাঘরের টিনের চালে ঝম্ ঝম্ বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম| বাবার ঘুম ভাঙ্গত খুব ভোরে, বোধ হয় সাড়ে চারটে নাগাদ| ঘুম ভাঙ্গলে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বাবা স্তোত্র আবৃত্তি করতেন| নানা সংস্কৃত কবিতার লাইন, পদাবলী, বৈষ্ণব পদাবলী, এছাড়া রবীন্দ্রনাথের কবিতার অফুরন্ত ভাণ্ডার তো ছিলই| ছোটবেলায় আমার স্মরণশক্তি খুব ভাল ছিল| শুনে শুনে প্রায় সব কবিতা, পদাবলী আমার মুখস্হ হয়ে গেছিল| কিছু স্তোত্র আবার পুজোয় লাগে| পরীক্ষার আগে শেষরাতে লন্ঠন জ্বালিয়ে স্তোত্র পাঠ করে আমরাও পরীক্ষার পড়া সুরু করতাম| ভোরের স্তোত্র, বাবা আবৃত্তি করতেন, রামকে নিয়ে|অর্থ বুঝতাম না, তাই মনে নেই| দুএক লাইন এখনও মনে আছে| যেমন, “রামং বিরামং বিপদা ভূপাশে |..মৈথিলী কন্যকায়া, সৌন্দর্য সর্বস্ব স্বীয় মহানিদানং, শশাঙ্কপঙ্কে…”| জানিনা, কালিদাসের “রঘুবংশম” এর লাইন কিনা| অনেক কবিতা মারও মুখস্হ ছিল, রান্না করতে করতে গুন গুন করে আবৃত্তি করতেন| কলেজ রোডের বাড়ির দেওয়লে কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো ছিল কার্পেটের উপর সূচ- রঙিন সূতো দিয়ে লেখা কিছু লাইন| যখন সবে বানান করতে শিখেছি, তখন ফ্রেমের লেখা একদিন পড়লাম,-
“বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়, দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই বা দিলে সান্ত্বনা, দুঃখে যেন করিতে পারি জয়||”
আমি অবশ্য স্কুলের পড়া বিশেষ পড়তাম না| বাবা একদিন ধরলেন, দুলাল(আমার ডাক নাম তুই পড়তে বসিস না কেন? আমি উত্তর দিতাম, আমার সব মুখস্হ| সত্যি মুখস্হ কিনা বাবা বই হাতে প্রশ্ন করলেন| মুখস্হ নেই এমন কিছু পাওয়া গেল না|
বাবা কত যে কবিতার লাইন আবৃত্তি করতেন তার ইয়ত্তা নেই| যা কিছু নতুন পড়তেন এবং ভাল লাগত তা জোরে জোরে আবৃত্তি করতেন| বহুকাল পরে কিছু লাইনের উৎস আমি খুঁজে বের করেছি| মার খুব পছন্দের কতগুলি গান ছিল, যেমন , “ভালবেসে সখি নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে,…..||” বা “নুপূর বেজে যায় রিণি রিণি রিণি, আমারই মন কয় চিনি চিনি,.. ||” ” বা “পল্লির বালিকা বনপথে যাই,….||”
দিদিও ছোটবেলায় শুনে শুনে এই গানগুলি শিখেছিল| দিদির গানের গলা ছিল খুব মিষ্টি, নিজে নিজেই সব শিখেছে| দিদি শিল্পকলায় বিশেষ পারদর্শিনী ছিল যেমন, সূচিশিল্প, আলপনা দেওয়া, ছবি আঁকা, পেন্টিং| পরবর্তীকালে বেনারসে “উকিল’স স্কুল অব আর্টস” থেকে পেন্টিং এ ডিপ্লোমা লাভ করে| BHU(বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি থেকে এম্.এ. পাস করে সাইকোলজিতে| সারাজীবন হেডমিস্ট্রেস ছিল কসবার একটা স্কুলে| গানের শিক্ষক রেখে দিদিকে গান শেখানোর আর্থিক সঙ্গতি তখন বাবার ছিল না, নিজের চেষ্টায় শুনে শুনে যা শেখা সম্ভব তাই শিখেছে| আমার ছোট ভাই মন্টুর গানের গলাও ছিল খুব ভাল| নিজে নিজে তবলা বাজানো শিখেছিল| পড়াশুনায় ছিল খুব ভাল| প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে B.Sc. Maths(Hons এ First class পেয়েছিল, তারপর Radio physics Electronics এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে B.Tech ও M.Tech. পাস করে| পরবর্তী কালে USA যায় এবং Computer Hardware এ IBM Co.তে কাজ করে|
কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম, যা মনে আসছে লিখছি| লিখছিলাম ময়মনসিংহের কথা, বাবার কথা| অমন সোজা সরল মানুষ, শিশুর মত প্রাণখোলা হাসি, আজকাল বড় একটা দেখা যায় না| অর্থের প্রতি লোভ ছিল না, অর্থ উপার্জন যথেষ্ট পরিমানে করা দরকার এবং তাই নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা দরকার, যেন জানতেন না| যখন অর্থের প্রয়োজন উপলব্ধি করলেন তখন প্রচুর উপার্জন করেছেন বই লিখে, যদিও প্রকাশক Bookland pvt. Ltd. পাওনা রয়ালটি দিতে ভীষণ পিছলেমি করেছে| লহ্মীদেবির ভজনা না করলে তিনি সদয়া হন না| বাবা সরস্বতীর বন্দনা করে গেছেন সারজীবন, তাই বলতে গেলে সারাজীবন অভাব অনটন অর্থকৃচ্ছতা ভোগ করতে হয়েছে| তারই মধ্যে হাসিখুসি ছিলেন, হয়ত আবৃত্তি করছেনঃ
“এইমতো মেঘরূপে ফিরি দেশে দেশে, হৃদয় ভাসিয়া চলে উত্তরিতে শেষে, কামনার মোক্ষধাম অলকার মাঝে, বিরহিনী প্রিয়তমা যেথায় বিরাজে সৌন্দর্য্যের আদিসৃষ্টি| সেথা কে পারিত লয়ে যেতে তুমি ছাড়া| লহ্মীর বিলাসপুরী অমর ভুবনে, অনন্ত বসন্তে যেথা নিত্যপুষ্পবনে, ইন্দ্রনীল শৈলমূলে সুবর্ণসরোজফুল্ল সরোবরকূলে, মণিহর্মে অসীমসম্পদে নিমগনা, কাঁদিতেছে একাকিনী বিরহবেদনা|| দূরবাতায়ন হতে যায় তারে দেখা, শয্যাপ্রান্তে লীনতনু ক্ষীণশশিরেখা পূর্বগগণের পানে যেন অস্তপ্রায়| কবি তব বাক্যে আজি মুক্ত হয়ে যায়, রূদ্ধ এই হৃদয়ের ঝড়দৃষ্টি যত||…”
ফিরে আসি আবার ময়মনসিংহের কথায়| কলেজ রোডের বাড়িতে আমরা আট বছর ছিলাম| বাড়িতে অনেক বই ছিল, বেশিরভাগই বাবার পড়ার বা পড়ানোর সংস্কৃত বই, যেমন “রঘুবংশম”, “পতঞ্জলি গৃহ্যসূ্ত্র”, ইত্যাদি| বাংলা বই বলতে দুচারটে| তারমধ্যে একটার নাম এখনও মনে আছে, “অন্নপূর্ণার মন্দির”, নিরূপমা দেবীর লেখা| সম্ভবত মা বিয়েতে পেয়েছিলেন, আর ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের কয়েকটা উপন্যাস, দূর্গেশনন্দিনী, যুগলাঙ্গুরীয় ইত্যাদি| ক্লাস এইটে পড়ার সময় এগুলো পড়েফেলেছিলাম| বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা শক্ত হলেও কাহিনী অতিশয় চিত্তাকর্ষক| এই সময় বা তার আগে বছর দুই রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের বই পেলেই পড়ে ফেলতাম| গুলকিবাড়ির এক লাইব্রেরি থেকে আনতাম, স্কুলের লাইব্রেরি থেকেও আনতাম| পড়ার বই বড় একটা পড়তাম না, কারন একবার দুবার পড়লেই মুখস্হ হয়ে যেত, তারপর আর পড়তে ইচ্ছে করত না| অঙ্ক ভালবাসতাম, তাও বড় সোজা মনে হত|
আনন্দমোহন কলেজের বিরাট মাঠ ছিল| বন্ধুরা মিলে সেখানে দাড়িবাঁধা, ফুটবল ইত্যাদি খেলতাম| কলেজের বিরাট এক বাঁধানো দীঘি ছিল| সেখানে দলবেঁধে সাঁতার কাটতে যেতাম| আমার বয়স ৭/৮, আমি পাড়ে বসে আছি দেখে পাশের বাড়ির তাপসদা একদিন আমাকে ধরে পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে দিল| হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে জল খেয়ে মারা যাচ্ছি, কোনক্রমে কেউ একজন এসে আমাকে উদ্ধার করে| তারপর ২/৩ দিনের মধ্যেই হাত পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে সাতার শিখে গেলাম| কলেজের একটা জিমনাসিয়াম ছিল| সেখানে কলেজের ছাত্রদের ব্যায়াম ও কুস্তি শেখাতেন যশোদা মাল নামের এক প্রশিক্ষক| সেজদা কুস্তি শিখত| ক্লাস এইটে পড়ার সময় আমি ডন, বৈঠক শুরু করি| রিং এ ঝুলতে বেশ ভাল লাগত| বড় রোগা ছিলাম, তাই ছোলা-গুড় খাওয়া শুরু করি| কিন্তু বেজায় পেটব্যথার জন্য বেশি দিন খেতে পারিনি|
সেভেন-এইটে পড়ার সময় থেকে পড়ায় একটু মন দি| আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে ভাল ছাত্র ছিল সঞ্জয় লাহিড়ী, অঙ্কের অধ্যাপক অশ্বিনী লাহিড়ীর পুত্র| ক্লাস থ্রি থেকে প্রত্যেক পরীক্ষায় সব বিষয়ে এবং সব সেকসন মিলিয়ে ফার্স্ট হোত, আর অঙ্কে পেত ১০০ তে ১০০ | স্বাধীনতার পর ও কলকাতায় চলে যায়| ও ছিল না বলেই হয়ত এইটে আমি সব সেকসন মিলিয়ে ফার্স্ট হই| এই সময় থেকে আমার পড়াশুনায় প্রবল একাগ্রতা ও মনোনিবেশ আরম্ভ হয়| এই সময় কি জন্য জানি সেজদা কলকাতা যায়| ফেরার সময় আমার জন্য একটা পেন কিনে আনে, signature 2 nib. আমার দারুন আনন্দ, জীবনের প্রথম পেন, আমরা লিখতাম হ্যাণ্ডেলে দুপয়সা দিয়ে কেনা নিব লাগিয়ে, কালির দোয়াতে চুবিয়ে নিয়ে| আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষাও দিয়েছি এইভাবে কালির দোয়াত সঙ্গে নিয়ে| সেজদার আনা পেনটা বেশি দিন চলল না|
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পঞ্চাশের মন্বন্তর,-এদের যৌথ আক্রমণে আমাদের আর্থিক অনটন বেড়েই চলল, কিন্তু তাও আমরা সুখেই ছিলাম, আনন্দেই ছিলাম| সে সুখ বেশিদিন স্হায়ী হল না, জাতিদাঙ্গা শুরু হল পূর্বপাকিস্তানে| মারামারি হানাহানি, অগ্নিসংযোগ, নিরীহ নিরপরাধদের নির্বিচারে হত্যা ময়মনসিংহে আমাদের বাস অসম্ভব করে তুলল| সব কিছু পিছনে ফেলে রেখে প্রণভয়ে একবস্ত্রে ময়মনসিংহ ছেড়ে আমরা রওনা হলাম অজানা ভবিষ্যতের দিকে, ২৩-২৪শে মার্চ, ১৯৫০. আক্ষরিক অর্থে বাস্তুহারা এক পরিবার, শিয়ালদহ মেন স্টেশনের লঙরখানা মধ্যরাতে যাদের ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করেছে, স্টেশনের পাশের খোয়ার রাস্তা যাদের শয্যা, উন্মুক্ত আকাশ যাদের আশ্রয়স্হল হয়ে উঠল| এসম্বন্ধে বিস্তারিত Udbastu2.pdf লেখায় রয়েছে|
বাবার চাকরি নেই, যৎসামন্য সঞ্চয় দেখতে না দেখতে শেষ হয়ে গেল| এই অবস্হায় আমাদের ছয় ভাইবোন ও বাবা মা, মোট আট জনের রোজকার অন্নসংস্হান করতে হয়েছে মাকে| মহিয়সী মহিলা, অপরিসীম সহ্য শক্তি নিয়ে বটগাছের মত আমাদের ছায়া দিয়ে গেছেন, আমাদের নানা অসুবিধা সামলেছেন, আর বাবা দিন নেই রাত্রি নেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন চাকরির সন্ধানে, কিন্তু কোথায় চাকরি!
পরবরতী আংশ “Udbastu” blog-a আছে|

Leave a comment